ভারতে তামিলনাড়ু রাজ্যে আত্মপ্রকাশ করে প্রথম নির্বাচনেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায় অভিনয় থেকে রাজনীতিতে আসা থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে।
ভারতে ৫ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের নির্বাচনে গোটা দেশের চোখ পাশ্চিমবঙ্গের দিকে থাকলেও গণনার দিন প্রচারের আলো এই রাজ্য থেকে কিছুটা হলেও কেড়ে নিয়েছে তামিলনাড়ু।
তামিল রাজনীতির দুই প্রধান শক্তি ডিএমকে (দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম) এবং এআইএডিএমকে (অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজগাম)- কে পিছনে ফেলে ইতিহাস গড়ার পথে সুপারস্টার অভিনেতা থালাপতি বিজয়ের দল টিভিকে (তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম)। আত্মপ্রকাশ করে প্রথম নির্বাচনেই তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায়।
অভিনয় থেকে রাজনীতিতে আসা জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর ওরফে থালাপতি বিজয় চলতি বিধানসভা নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে জয়ী হলে তামিলনাড়ুর প্রায় ৪৯ বছরের রাজনৈতিক ধারার অবসান ঘটতে পারে।
কারণ, ১৯৭৭ সালের পর আর কোনও চলচ্চিত্র তারকা সরাসরি জনগণের ভোটে এই রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারেননি।
তাছাড়া, রাজ্যটি মূলত সেই সময় থেকেই ডিএমকে অথবা এআইএডিএমকে পর্যায়ক্রমে শাসন করে আসছে। রাজ্যের রাজনীতিতে এই দুই দলের বাইরে তৃতীয় কোনো বড় শক্তি সেভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনি।
এবারের নির্বচনে বিজয়ের দল টিভিকে তৃতীয় বড় বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা রাজ্যের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় শাসনের একচেটিয়া এই রাজনৈতিক ধারায় বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে।
১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা ও রাজনীতিবিদ এম.জি. রামচন্দ্রন তামিলনাড়ুর ক্ষমতায় এসেছিলেন এবং টানা এক দশকের বেশি সময় রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন। তিনি তার বিপুল জনপ্রিয়তাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করে জনকল্যাণমূলক রাজনীতির এক নতুন ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এরপর আর কোনও অভিনেতা সেই চূড়ান্ত নির্বাচনী সীমা পেরোতে পারেননি, যদিও একাধিক প্রচেষ্টা এবং ভক্তদের বিপুল সমর্থন ছিল।
পরবর্তীতে জয়ললিতা নিজে বড় মাপের চলচ্চিত্র তারকা হয়েও মুতামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হন। তবে তিনি নিজস্ব নতুন দল গড়ে নয়, বরং তার রাজনৈতিক গুরু এম.জি. রামচন্দ্রনের প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে-এর নেতৃত্ব নিয়েই ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন।
কিন্তু ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ট্রেন্ড বলছে, বিজয়ের তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) মাত্র দুই বছর পুরোনো দল হলেও তারা প্রায় ১০০–১১৮ আসনের রেঞ্জে আছে। তামিলনাড়ুর ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য ১১৮টি আসন প্রয়োজন, ফলে বিজয়ের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোরগোড়ায়।
বিজয়ের এই উত্থান দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফল। এটি তার পূর্বসূরি অভিনেতাদের থেকে ভিন্ন ছিল।
২০০৯ সালে বিজয় তার ভক্তদের ক্লাবগুলোকে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কম’ হিসেবে সংগঠিত করেন। এটি শুরুতে একটি সামাজিক ও সেবামূলক প্ল্যাটফর্ম ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগঠনটি ত্রাণকাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত হয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেটওয়ার্কে পরিণত হয়।
২০১১ সালে তিনি প্রথম প্রকাশ্যে এআইএডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দেন। এটি ছিল বিজয়ের প্রথম সরাসরি নির্বাচনী অবস্থান এবং একটি পরীক্ষা যে, তারকাখ্যাতি ভোট কুড়াতে পারে কি না।
এরপর ২০১০-এর দশকের শেষভাগ এবং ২০২০-এর দশকের শুরুর দিকে ধীরে ধীরে তার জনসভা, চলচ্চিত্র-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে রাজনৈতিক বক্তব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএন) সমালোচনা তার সিনেমার বাইরেও অবস্থান নেওয়ার ইচ্ছার ইঙ্গিত দেয়। তিনি বেকারত্ব, শিক্ষা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে শুরু করেন, যা বিশেষ করে তরুণ ও প্রথম ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলে।
এভাবে দল আত্মপ্রকাশের আগেই বিজয়ের সাংগঠনিক সক্ষমতার প্রমাণ মেলে। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কামের প্রার্থীরা যে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল তার বেশিরভাগেই জয় পায়। এতে প্রমাণ হয়, এই নেটওয়ার্ক কেবল জনপ্রিয়তা নয়, ভোটও টানতে পারে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিজয় থালাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম দল গঠন করেন এবং কোনো জোট ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি জানিয়েছিলেন, টিভিকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এককভাবে লড়বে, নির্বাচনপূর্ব জোট প্রত্যাখ্যান করবে এবং ডিএমকে-এআইএডিএমকের দ্বৈত আধিপত্যের বিকল্প হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করবে।
এরপর প্রায় তিন দশকের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ার থেকে সরে এসে বিজয় পুরোপুরি রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। বার্তাটি ছিল পরিষ্কার— রাজনীতি কোনো পার্শ্ব প্রকল্প নয়।
পরের দুই বছর টিভিকে একটি পূর্ণাঙ্গ দলে রূপ নেয়। জেলা কমিটি, বিধানসভা ইউনিট, বুথ পর্যায়ের সংগঠন গড়ে তোলে। একই সঙ্গে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য শাণিত করে।
তবে এই পথচলা বাধাহীন ছিল না। ২০২৫ সালে কারুরে টিভিকে- এর এক জনসভায় প্রাণঘাতী পদদলনের ঘটনা বিজয়কে প্রথম বড় রাজনৈতিক সংকটে ফেলে। এতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিজয় প্রকাশ্যে ঘটনার দায় স্বীকার করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন, যা তার রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হয়। এখন ভোটের পরিসংখ্যান বলছে, তার এই ঝুঁকি নেওয়া কাজ করেছে।
পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও মোটামুটি ১১০ আসন পেলে বিজয় সরকার গঠনের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবেন। উঠে আসবেকন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বা অন্তত অপরিহার্য শক্তি হিসেবে।
টিভিকে যখন ডিএমকে-নেতৃত্বাধীন জোট এবং দুর্বল হলেও উপস্থিত এআইএডিএমকে-এর পাশাপাশি শক্তিশালী মেরু হিসেবে উঠে আসছে, তখন তামিলনাড়ু এমন এক ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগোচ্ছে, যা এম.জি. রামচন্দ্রনের উত্থান পরবর্তী সময়ের মতোই আলোড়ন সৃষ্টিকারী।
ছোট দলগুলো, যারা এতদিন দুই দ্রাবিড় শক্তির একটির সঙ্গে জোটে নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন এক তৃতীয় কেন্দ্র দেখতে পাচ্ছে।

logo-2-1757314069.png)
