যেভাবে হরমুজ প্রণালী ‘শক্ত হাতে’ নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০০:২৩
গত প্রায় চার সপ্তাহ ধরে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ, যা বিশ্বজুড়ে তেলের বাজারে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হুমকি ও বিভিন্ন জাহাজে হামলার কারণে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যাতায়াতের ঝুঁকি এতটাই বেড়ে গেছে যে, বর্তমানে প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। এই পথটি বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সারের প্রধান সরবরাহ পথ। জ্বালানি সংকট গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ প্রত্যাহারে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর কথা প্রচার করছেন। একইসঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আরও হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করছেন এবং তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারার (এসকর্ট) ব্যবস্থা করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।
তবে অনেক দিক থেকেই ইরান এখনো সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর একটি কারণ তাদের অপ্রচলিত যুদ্ধকৌশল, যার মধ্যে রয়েছে সস্তা ড্রোন ও সামুদ্রিক মাইন। আরেকটি কারণ হলো দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। এ দুই বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যদের পক্ষে জাহাজ রক্ষা করা বা সামরিকভাবে এই প্রণালীকে নিরাপদ রাখা অত্যন্ত কঠিন। হরমুজ প্রণালীতে এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য আর্থিকভাবেও লাভজনক। গত ২৩ মার্চ ‘লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা কিছু ট্যাংকারের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ফি আদায় অব্যাহত রাখবেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত দুটি জাহাজ পার হওয়ার জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান কেন ইরানের পক্ষে?
শিপিং অ্যানালিটিক্স ফার্ম ‘ভরটেক্সা’র মতে, হরমুজ প্রণালী এর সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্টে মাত্র ২৪ মাইল চওড়া। প্রায় সব ধরনের জাহাজ চলাচলের পথ মূলত দুটি প্রধান লেনের মধ্য দিয়ে, যা আরও বেশি সরু। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) সিনিয়র ফেলো নিক চাইল্ডস বলেন, এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’ (প্রতিবন্ধক পথ) বলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশ্বে এমন অনেক পথ রয়েছে কিন্তু এটি অনন্যভাবে চ্যালেঞ্জিং, কারণ এর কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো জাহাজ বা এসকর্টে থাকা নৌযানের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এখানে কৌশল পরিবর্তন বা সরে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জার্নাল এডিটর কেভিন রোল্যান্ডস বলেন, খোলা সমুদ্রে সবসময় পথ পরিবর্তনের সুযোগ থাকে কিন্তু এই সংকীর্ণ জলপথে সেটি অসম্ভব। এর মানে হলো ইরানকে তার লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করার জন্য পরিশ্রম করতে হয় না। তারা কেবল এক জায়গায় বসে অপেক্ষা করলেই চলে। তিনি আরও বলেন, এটি কার্যত একটি ‘কিল জোন’ তৈরি করে, যেখানে কোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে সতর্ক হওয়ার জন্য মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় পাওয়া যায়। তাছাড়া ইরানের প্রায় ১০০০ মাইল দীর্ঘ উপকূলরেখা রয়েছে, যেখান থেকে তারা জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাটারিগুলো স্থানান্তরযোগ্য হওয়ায় এগুলো ধ্বংস করা কঠিন। আর দীর্ঘ উপকূলরেখার কারণে ইরান হরমুজ প্রণালীর অনেক বাইরেও আক্রমণ চালাতে সক্ষম। রোল্যান্ডস জানান, ইরানের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলটি সমতল নয়। সেখানে পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা এবং অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে। এই প্রাকৃতিক গঠন আগত হুমকি শনাক্ত করা কঠিন করে তোলে এবং ইরানের জন্য তাদের স্থানান্তরযোগ্য অস্ত্র ব্যবস্থা লুকিয়ে রাখা সহজ করে দেয়।

logo-2-1757314069.png)
