ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছে না মিত্ররা, পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ০৮:৫০
বৈশ্বিক
জ্বালানি তেল সরবরাহের অন্যতম
গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি
খোলা রাখতে মিত্র দেশগুলোর কাছে সামরিক সহায়তা
চেয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু তারা সেই অনুরোধ
প্রত্যাখ্যান করেছেন অনেকে।
প্রধান
মিত্র দেশ যুক্তরাজ্যই জানিয়েছে,
তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত যুদ্ধে জড়াতে চায় না। উপসাগরীয়
মিত্র দেশগুলো এখন পর্যন্ত যুদ্ধে
জড়ানোর ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। ন্যাটোকে
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিলেও সংস্থাটি সেই হুমকি অগ্রাহ্য
করেছে। এদিকে এই দেনদরবারের মধ্যে
ইসরায়েল ও ইরানের পালটাপালটি
হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকালও হামলার শিকার হয়েছে দুবাই বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনা।
চাপ
বাড়াতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি
পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি
বন্ধ করে দিয়েছে। এর
ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। এই
অবস্থায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্ভাব্য একটি আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা জোট গঠনের প্রস্তাব
দিয়েছেন। এই জোটের কাজ
হবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক
জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে
দেওয়া।
ট্রাম্পের
যুক্তি, উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর
উচিত এই নৌপথের নিরাপত্তা
বিধানে সহায়তা করা। এর পুরো
বোঝা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কাঁধে
চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।
ব্রিটিশ
পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে,
ট্রাম্প বেশ কয়েকটি দেশকে
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক
জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়ার
জন্য যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি যেসব
দেশকে এই জোটে অন্তর্ভুক্ত
করতে চাইছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, চীন, জাপান, দক্ষিণ
কোরিয়া এবং জ্বালানি আমদানিকারক
অন্যান্য প্রধান রাষ্ট্র।
মধ্যপ্রাচ্যের
চরম উত্তেজনার মধ্যে এই জলপথে যুদ্ধজাহাজ
মোতায়েনের ট্রাম্পের আহ্বান সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে
অস্ট্রেলিয়া ও জাপান। অন্যদিকে
ইউরোপীয় মিত্র জার্মানি ও ফ্রান্সও এই
মুহূর্তে সরাসরি কোনো সামরিক অভিযানে
যুক্ত হতে অনীহা প্রকাশ
করেছে।
ইরানের
কার্যকর অবরোধের মুখে থাকা এই
রুটটি নিয়ে এখন বড়
ধরনের কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটে
পড়েছে ওয়াশিংটন। অস্ট্রেলিয়ার পরিবহনমন্ত্রী ক্যাথেরিন কিং মার্কিন অনুরোধের
প্রেক্ষিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ক্যানবেরা হরমুজ প্রণালিতে কোনো যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে
না।
জাপানের
প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি পার্লামেন্টে
জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাঙ্কার পাহারা
দিতে নৌযান পাঠানোর কোনো পরিকল্পনা টোকিওর
নেই। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, ট্রাম্পের এই আহ্বানকে তারা
গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং আমেরিকার
সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় ও সতর্ক পর্যালোচনার
মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। তবে কোনো সিদ্ধান্ত
হয়নি। ইতিমধ্যে দেশটিতে যুদ্ধবিরোধী বড় বিক্ষোভ হয়েছে।
ফলে সরকার চাপে পড়বে।
অনেক
দেশই আশঙ্কা করছে, যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হলে তারা
সরাসরি ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর সংঘাতে
জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে
বন্ধু দেশগুলোর এই সতর্ক অবস্থান
ট্রাম্পের মনঃপূত হয়নি।
তিনি
হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, নর্থ
আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায়
সহায়তা না করে, তবে
ঐ সংস্থার ভবিষ্যত্ অত্যন্ত খারাপ হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের
কর্ম এবং পেনশন মন্ত্রী
প্যাট মেকফেডান বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যে ধরনের পরিস্থিতি
আমরা দেখছি, তা মাথায় রেখে
ন্যাটো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।’ বিবিসি রেডিও ফোরের গতকালের এক অনুষ্ঠানে এ
কথা বলেন তিনি। এর
আগে সকালে আরেক অনুষ্ঠানে দেশটির
সাবেক প্রতিরক্ষা প্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টার বলেছেন,
ন্যাটো এমন কোনো জোট
নয়, যা কোনো মিত্রের
জন্য তৈরি করা হয়েছিল,
যাতে তারা নিজের ইচ্ছেমতো
যুদ্ধে যায় এবং পরে
অন্য সবাইকে তা অনুসরণ করতে
বাধ্য করে।
স্যার
নিক কার্টারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত কিনা জানতে
চাইলে মন্ত্রী প্যাট মেকফেডান বলেন, জেনারেল কার্টার সঠিক এবং বর্তমান
যুদ্ধকে ন্যাটো যুদ্ধ নয়, বরং মার্কিন-ইসরাইলি পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এরপর
গতকাল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার বলেন,
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে কোনোভাবেই পুতিনের জন্য বাড়তি কোনো
সুবিধা বা আশীর্বাদ হওয়ার
সুযোগ দেওয়া যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের
এই বিস্তৃত যুদ্ধে তার দেশ জড়াতে
চায় না বলেও জানান
স্টারমার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি খুলতে চীনেরও সহায়তা চেয়েছেন।
তবে
চীন এরপর ইরানে সামরিক
অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। চলতি মাসের শেষদিকে
বেইজিং সফরে যাওয়ার কথা
রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। হরমুজ খুলতে চাপ সৃষ্টি করতে
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সফর পিছিয়ে
দিতে পারেন।
পাল্টাপাল্টি
হামলা অব্যাহত
ইরানের
কিছু অংশে ব্যাপক পরিসরে
হামলা করেছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তারা বলেছে,
তেহরান, শিরাজ এবং তাবরিজে ইরানি
শাসনের অবকাঠামো লক্ষ্য করে আইডিএফ ব্যাপক
পরিসরে হামলা করেছে।
ইসরায়েলি
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এল্লা ওয়াভিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, খামেনি যে বিমানটি ব্যবহার
করতেন সেটি ধ্বংস করা
হয়েছে।
লোহিতসাগরে
মার্কিন বিমানবাহী রণতরি জেরাল্ড ফোর্ডকে ইরান তাদের জন্য
হুমকি হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছে খাতাম
আল আনবিয়া ঘাঁটির একজন মুখপাত্র। ড্রোন
হামলায় জ্বালানি ট্যাঙ্কে আগুন লাগার পর
দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে
আনা হয়েছে। এতে কেউ হতাহত
হয়নি বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
যুদ্ধ
শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে
প্রায় ২ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র
ও ড্রোন ছুড়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে,
রাতভর তারা কয়েক ডজন
ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
একই
সময়ে ইরাক ও কুয়েতও
নতুন হামলার খবর দিয়েছে। আলোচনায়
আমেরিকাকে ইরাক কখনোই পুরোপুরি
বিশ্বাস করেনি বলে দাবি করেছেন
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বাঘায়ি। —বিবিসি, রয়টার্স ও আল জাজিরা
ইত্তেফাক/এসআর

logo-2-1757314069.png)
