বিএনপির অবস্থান ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে: মাহ্দী আমিন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:৩০
গণভোটকে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখেই বিএনপি ইতিমধ্যেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের ৩১ দফার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংস্কারের ধারক ও বাহক হিসেবে দলের এই অবস্থান জাতীয় ঐকমত্য কমিশনেও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহ্দী আমিন।
বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ বক্তব্য তিনি দেন সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে।
গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে অবস্থানজনিত বিষয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণকারী রাজনৈতিক দল হিসেবে সবার আগে আমরা সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলাম ২০১৬ সালের ভিশন ২০৩০, ২০২২ সালের ২৭ দফা এবং ২০২৩ সালের ৩১ দফা এর উপর ভিত্তি করে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিএনপি যেভাবে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও গুরুত্বের সাথে সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, সেই আলোকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সংস্কারের ধারক, বাহক ও জনক রাজনৈতিক দল হিসেবে, জুলাই চার্টারে আমাদের অবস্থান ও প্রণীত নোট অফ ডিসেন্ট অনুযায়ী বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, যা ইতিমধ্যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব থেকেও জানানো হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র বলেন, ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আমরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছি। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এ নির্বাচনে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে। একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মাধ্যমে প্রতিটি রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ পাবে, এটিই জনগণের প্রত্যাশা। তবে গত কয়েকদিন ধরে আমরা দুঃখজনকভাবে দেখেছি, নানা উপায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করা হচ্ছে এবং একটি বিতর্কিত নির্বাচন প্রক্রিয়া সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় অনুভূতির ক্রমাগত অপব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ (গণমাধ্যমে দেখা গেছে) তাদের মার্কায় ভোট দিতে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ করানো হচ্ছে, যা সরাসরি নির্বাচন আচরণবিধির লঙ্ঘন। শুধু তাই নয়, সেই দলটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছে, যার পেছনে অসাধু উদ্দেশ্য রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতিপূর্বে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে, যেমন: বাহরাইন, ওমান, কুয়েত ও সৌদি আরবে শত শত ব্যালট একটি নির্দিষ্ট দলের কর্মীদের কাছে রয়েছে, যা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কারণ সংঘবদ্ধ ভোট সম্পূর্ণ বেআইনি। কোথাও একজনের নাম্বার ব্যবহার করে আরেকজনের পোস্টাল ব্যালট পেপার সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত। যেহেতু বাংলাদেশে প্রবাসীদের ভোটদান প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে, আমরা চাই প্রবাসীদের ভোটের ক্ষেত্রেও সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হোক। উল্লেখ্য, বিএনপিই সর্বপ্রথম প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিল।
মাহ্দী আমিন বলেন, দুঃখজনকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পোস্টাল ব্যালটের ক্ষেত্রে ধানের শীষ প্রতীকের অবস্থান নিচের দিকে, যা সহজে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাঁজ করলে ধানের শীষ প্রতীক চোখে পড়ে না বা দাগের কারণে মুছে যেতে পারে। অথচ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতীকের অবস্থান সহজে দেখা যায় এমন জায়গায় রাখা হয়েছে। চাইলেই কলাম বা লাইনের সংখ্যা পুনঃবিন্যাস করে প্রতীকের অবস্থানগত বৈষম্য দূর করা যেত এবং পোস্টাল ব্যালটকে স্বচ্ছ রাখা যেত। তিনি আরও বলেন, গত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী আমলের গুম, খুন, হামলা ও মামলার সময়ে বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী দেশের বাইরে ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সেখানে নাগরিকত্ব ছিল এবং মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নাগরিকত্ব প্রত্যাহারের আবেদন করেছিলেন। সেই আবেদনপত্র থাকার পরও নির্বাচন কমিশনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধানের আর্টিকেল ৬৬ অনুযায়ী এখানে কোনো অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের অবকাশ নেই। মাহ্দী আমিন বলেন, আমরা দেখেছি, বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাদের প্রতীকসহ সরাসরি প্রার্থী ও দলের জন্য ভোট চাইছে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং অনলাইনের মাধ্যমে। অথচ, বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান ব্যক্তিগত সফরে তার নানীর কবর জিয়ারত বা মওলানা ভাসানী ও গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদসহ অন্যান্য শহীদদের কবর জিয়ারতে বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের কয়েকটি জেলায় যেতে চাইলেও সেই ব্যক্তিগত-ধর্মীয় সফরকে স্থগিত করার জন্য নির্বাচন কমিশন থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। সেই অনুরোধকে সম্মান জানিয়ে তিনি নির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন। অন্য দল ও নেতারা প্রতিনিয়ত আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। নির্বাচন কমিশনের এই নির্লিপ্ততা অনাকাঙ্ক্ষিত।
তিনি বলেন, এটি দুঃখজনক যে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার চলছে। মিসইনফরমেশন, ডিসইনফরমেশন ও ক্যারেক্টার অ্যাসাসিনেশন করা হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে বিএনপি নির্বাচন কমিশনে ফ্যাক্ট-চেকিং সেল গঠনের দাবি জানিয়েছে। আমরা আহ্বান জানাচ্ছি, দেশজুড়ে ফ্যাক্ট-চেকিং সেল দ্রুত কার্যকর করা হোক। তিনি নিশ্চিত করেন, তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার Zaima Rahman’র ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম আইডি সম্প্রতি মেটা কর্তৃক ভেরিফাই করা হয়েছে। ব্লু টিক ছাড়া তার আর কোনো অফিসিয়াল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নেই। মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপির আইসিটি দপ্তর কর্তৃক ৫০টিরও বেশি ফেইক আইডি ও পেজ রিমুভ করা হয়েছে। এসব হ্যান্ডেল থেকে ডিপফেইক ও এআই-জেনারেটেড ভিডিও পোস্ট করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছিল। আরও কিছু আইডি ও পেজ অবশিষ্ট আছে; সেগুলো অপসারণের বিষয়ে মেটা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ চলমান। তিনি আরও বলেন, বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের নামে অনেক ফেইক ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। এসব পেজে এআই দিয়ে তৈরি বানোয়াট ও মিথ্যা ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। ডা. জুবাইদা রহমানের কোনো সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট বা পেজ নেই। তাই সবাইকে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। নির্বাচনের সময়ে গণমানুষের সাথে সম্পৃক্ততার লক্ষ্যে বিএনপি ইতিমধ্যে কল সেন্টার চালু করেছে। যেকোনো ব্যক্তি যেকোনো বিষয়ে অনুসন্ধান, তথ্য, পরামর্শ বা অভিযোগ জানাতে ১৬৫৪৩ নম্বরে কল করতে পারবেন। তিনি বলেন, বিএনপি প্রণীত বিভিন্ন পলিসির জনমত তৈরি ও গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণের লক্ষ্যে ‘Match My Policy’ কার্যক্রম শুরু করেছে। ওয়েবসাইটের লিংক: https://www.matchmypolicy.net। এখানে বিএনপির প্রতিটি সেক্টরের মূল পলিসি বিষয়ে যে কেউ ব্যক্তিগত মতামত, পছন্দ-অপছন্দ জানাতে পারবেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের মতামতকে সম্মান ও প্রাধান্য দেওয়া। মাহ্দী আমিন বলেন, আমাদের সম্মানিত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করবেন আগামী ২২ জানুয়ারি সিলেট সফরের মধ্য দিয়ে। বিস্তারিত পরবর্তীতে জানানো হবে। আসন্ন নির্বাচনকে সুন্দর, সফল, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে গণতন্ত্রকামী প্রতিটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের বড় ভূমিকা আছে। আসুন সবাই মিলে জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করি এবং একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করি।

logo-2-1757314069.png)
