‘সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, প্রভু নেই’, বিএনপির ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতি
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:২৩
‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই মূল দর্শনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ঘোষিত ইশতেহারে পররাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেছে। ইশতেহারে স্পষ্ট করা হয়েছে, দেশের ‘সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কিন্তু কোনো প্রভু নেই’। এতে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়, মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং সীমান্তে হত্যা বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হয়েছে।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ইশতেহার উপস্থাপন করেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
ইশতেহারে বিএনপির ঘোষিত পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে উল্লিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো:
পররাষ্ট্রনীতি
বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-‘সবার আগে বাংলাদেশ’। বিএনপি বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের সীমান্তের বাইরে বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই। পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।
দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক: বিএনপি সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতা, ন্যায্যতা, বাস্তবধর্মী, পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি ভিত্তিক এবং আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে। বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।
বাণিজ্য সুবিধা রক্ষা: গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক শক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদার দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করা হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সুবিধা রক্ষায় কার্যকর কূটনীতি গ্রহণ করা হবে।
রোহিঙ্গা সমস্যা: রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান করা বিএনপির অগ্রাধিকার। দীর্ঘ আট বছর ধরে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি। বিএনপি দুইবার (১৯৭৮ এবং ১৯৯২) রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সফল হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায়, বিএনপি রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের পূর্ণ অধিকারসহ মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রতিবেশী দেশসমূহ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক: প্রতিবেশীদের সাথে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সম্মিলিত অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও ন্যায্যতা সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে। উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা সর্বদা অব্যাহত থাকবে। আন্তঃ সীমান্ত নদী ও জলসম্পদ: পদ্মা, তিস্তা এবং বাংলাদেশের সকল আন্তঃসীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা: বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে কোনো আঘাত স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইন বন্ধসহ সব অন্যায্য কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার এবং মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা হবে।
মুসলিম বিশ্ব: মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বিএনপির ঐতিহাসিকভাবে গভীর সম্পর্ক ছিল। সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী করার জন্য আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব গঠন: উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মিলে বাংলাদেশ একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চায়, যার লক্ষ্য হবে উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বৃত্ত পুঁজিকে বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের সাথে একত্রিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, খাদ্য নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর, সাইবার করে অর্থনৈতিক সংহতি অর্জন করা। এই অংশীদারিত্ব পারস্পরিক নিরাপত্তা এবং সামরিক শিল্প ও প্রশিক্ষণ বিষয়ক সহায়তা বৃদ্ধির জন্য কাজ করবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক: ইন্দোপ্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে শক্তিশালী ভূমিকা গ্রহণ করা হবে। সম্পর্ক জোরদার করার জন্য আমরা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের সাথে একসঙ্গে কাজ করব। আসিয়ানের পূর্ণ সদস্যপদ অর্জন ও সার্ক কার্যকর করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। সার্ক ও আসিয়ান অঞ্চলের পাশাপাশি আমেরিকা, ইউরোপ, প্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ওশেনিয়া অঞ্চলের দেশ এবং অর্থনৈতিক জোটগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব: কৃষি ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ মোকাবিলা, মেরিটাইম সিকিউরিটি, ফ্রিডম অব নেভিগেশন, উপকূলীয় নিরাপত্তা এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি বজায় রাখার জন্য আঞ্চলিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করা হবে।
সফট পাওয়ার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কূটনীতিতে গুরুত্বারোপ: দীর্ঘমেয়াদে দেশের উন্নয়ন এবং ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ বৃদ্ধির জন্য সফট পাওয়ার কূটনীতি এবং ক্রীড়া কূটনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষা-বিনিময় কর্মসূচির অধীনে শিক্ষক, গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বেসরকারি নীতি প্রণেতা ও যুব-রাজনীতিবিদদের একটি পুল গড়ে তোলা হবে। সাংস্কৃতিক কূটনীতি প্রসারে বাংলাদেশী সংস্কৃতিমনা তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক পর্যায়ে সম্পৃক্ত করা হবে। এই সকল সক্রিয় কর্মসূচির মাধ্যমে সফট পাওয়ার বৃদ্ধি করা হবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক সক্ষমতা: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ও দূতাবাসসমূহে জনবল, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাড়তি নিয়োগ, বিদেশে মিশন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। প্রবাসীদের কল্যাণের জন্য দূতাবাস সমূহের সক্ষমতা ও তৎপরতা বৃদ্ধি করা হবে।

logo-2-1757314069.png)
