Logo
×

শিক্ষা

শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাংলা নববর্ষ; বাঙালি সংস্কৃতির চরম বাস্তবতা

Icon

নাজমুস সাকিব, ইবি প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৪:১২

শিক্ষার্থীদের ভাবনায় বাংলা নববর্ষ; বাঙালি সংস্কৃতির চরম বাস্তবতা

বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ এলেই বাঙালিয়ানা ফিরে আসে নতুন রূপে। দিনটি ঘিরে নানা আয়োজন, উৎসবমুখর পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক চর্চা চোখে পড়ে সর্বত্র। তবে সারাবছর সেই চর্চার উপস্থিতি কতটা দৃশ্যমান, কিংবা তা কি কেবল একটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? এ প্রশ্ন থেকেই যায়।


বাঙালি সংস্কৃতি এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ধারক, যা আমাদের ইতিহাস, জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তবুও সময়ের প্রবাহে এই সংস্কৃতির চর্চা ধীরে ধীরে কেবল বিশেষ কিছু দিন ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব, জীবনধারায় পরিবর্তন এবং ঐতিহ্যের প্রতি ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। একই সঙ্গে অনেকেই আবার নিজেদের শিকড় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করছেন। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) কয়েকজন শিক্ষার্থীর মতামত এই প্রতিবেদনে তুলে ধরেছি।


পহেলা বৈশাখ আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ: তাওহীদ ইসলাম, শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ 


বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ বাঙালির অস্থিমজ্জার সঙ্গে জড়িত। এটি আমাদের পরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। বছরের প্রথম দিনে নতুন পোশাক পরে বৈশাখী মেলায় যাওয়া, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, এসব কেবল রীতিই নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখার অনন্য উপায়। এই উৎসব আমাদের শেখায় পুরোনো দুঃখ-কষ্ট ভুলে নতুন বছরে নতুন আশায় এগিয়ে যেতে।


পহেলা বৈশাখ সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মাধ্যম। ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে এই উৎসব উদ্‌যাপনে মেতে ওঠে। একসময় হালখাতার মাধ্যমে পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন বছরের সূচনা করা হতো। পাশাপাশি নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তির মতো নানা ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ছিল এই দিনের আকর্ষণ।


বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেও বৈশাখী উৎসব ধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। তবে দুঃখজনকভাবে বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাবে পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি এখন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আগের মতো ৩ বা ৭ দিনের বড় মেলা বা বিস্তৃত আয়োজন তেমন দেখা যায় না; বরং কয়েক ঘণ্টার র‍্যালি বা শোভাযাত্রার মধ্যেই উদ্‌যাপন শেষ হয়ে যায়। তাই পহেলা বৈশাখকে কেবল উৎসব নয়, আমাদের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা জরুরি।



বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের উপলক্ষ্য ‘পহেলা বৈশাখ’: রিদিতা খাতুন, শিক্ষার্থী, চারুকলা বিভাগ 


পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। তবে অন্যান্য নববর্ষের মতো এটি শুধু আনন্দ-উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যায়, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ক্রমেই বিদেশি পোশাক-আশাক ও সংস্কৃতির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রবণতা স্পষ্ট।


শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ধীরে ধীরে বাঙালি সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, এমনকি অনেকাংশে তা ভুলতেও বসেছে। অথচ একসময় এই সংস্কৃতিই ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এখন তা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে মূলত পহেলা বৈশাখের একটি দিনের মধ্যে।


এদিন আমরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরি, বাঙালি খাবার খাই, শোভাযাত্রায় অংশ নিই; কিন্তু বছরের বাকি সময় এই চর্চা প্রায় অনুপস্থিত থাকে। পহেলা বৈশাখকে কেবল একটি উৎসব হিসেবে না দেখে, এটিকে আমাদের সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের একটি উপলক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এর প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা এটিকে একদিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিদিনের জীবনযাপনের অংশ করে তুলতে পারব।


আমরা বাঙালিরা নিজেদের স্বকীয়তা হারানোর পথে এগোচ্ছি: সুমাইয়া জাহান, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ 


বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিবছর বৈশাখের আগমনে আমরা নতুন বছরকে বরণ করি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে। বাঙালি নারী, পুরুষ ও শিশু সবাই সেদিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করেন, আর পান্তা-ইলিশের আয়োজনও থাকে, যা বাঙালির নিজস্ব খাদ্য-সংস্কৃতির প্রতিফলন।


তবে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুকরণে আমরা ধীরে ধীরে নিজেদের স্বকীয়তা হারানোর পথে এগোচ্ছি। নববর্ষের এই দিনটি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের শেকড় ও পরিচয়ের কথা। তাই এই দিনটিকে শুধু উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, যদি আমরা দৈনন্দিন জীবনেও এর চেতনা ধারণ করতে পারি, তবেই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভিড়ে আমাদের বাঙালিয়ানা টিকে থাকবে।


বছরব্যাপী সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়েই বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব: রাশেদুল ইসলাম রাকিব, শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ 


বাঙালি সংস্কৃতির কথা উঠলেই আমরা অনেক সময় এক ধরনের উদাসীনতা অনুভব করি। যে সংস্কৃতিকে ধারণ করেই আমাদের পূর্বপুরুষরা একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন, আজ সেটিকেই অনেকে ‘সেকেলে’ বলে মনে করে। ফলে নিজের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ ও চর্চা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পশ্চিমা সংস্কৃতির অতিরিক্ত প্রভাব।


একুশ শতকে এসে এই প্রবণতা আরও গভীর হয়েছে, যা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য উদ্বেগজনক। তবুও বাঙালির ইতিহাস আমাদের ঐক্যের শিক্ষা দেয়। ভাষা আন্দোলন যেমন আমাদের এক করেছে, তেমনি পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক। এটি আমাদের ভেদাভেদ ভুলিয়ে এক নতুন ঐক্যের বার্তা দেয়।


পহেলা বৈশাখ শুধু আনন্দ-উদ্‌যাপনের দিন নয়, বরং এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের স্মারক। আধুনিকতার সঙ্গে ভারসাম্য রেখে নিজস্ব সংস্কৃতিকে ধারণ করাই আজকের সময়ের প্রয়োজন। পান্তা-ইলিশের মতো প্রতীকী আয়োজন নয়, বরং সারা বছর সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়েই বাঙালিয়ানাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।