কালবৈশাখীর তাণ্ডবে গাইবান্ধা: ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, প্রাণহানি, খোলা আকাশের নিচে মানুষ
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৫৯
কালবৈশাখী ঝড় যেন হঠাৎ করেই ছিন্নভিন্ন করে দিল গাইবান্ধার জনপদ। কয়েক ঘণ্টার ঝড়-বৃষ্টি আর বজ্রপাতের তাণ্ডবে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত, ফসল নষ্ট, আর প্রাণ গেছে অন্তত পাঁচজনের। ভয়, আতঙ্ক আর ক্ষতির হিসাব মিলাতে না পেরে এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার বিভিন্ন উপজেলার মানুষ।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রোববার বিকেলের সেই ঝড় যেন এখনও মানুষের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ রেখে গেছে। গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ীসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ ইউনিয়নের জগদিশপুর গ্রামের কৃষক জ্যোতিষ চন্দ্র কাঁপা কণ্ঠে বলেন, ‘সকাল থেকেই আকাশটা অস্বাভাবিক লাগছিল। হঠাৎ ঝড় শুরু হতেই সব কিছু উল্টে গেল। ঘর কাঁপতে লাগল, টিন উড়ে যেতে লাগল। কোনোভাবে দুই সন্তানকে নিয়ে বাইরে বের হয়ে প্রাণে বাঁচলাম। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেল—জীবনটা শুধু বাঁচাতে পেরেছি।’
তার শয়নঘরসহ তিনটি ঘর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। সম্প্রতি নির্মাণ করা নতুন ঘরটিও ঝড়ে বিধ্বস্ত। এখন পরিবারের সঙ্গে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানোর শঙ্কা তার।
শুধু জ্যোতিষ চন্দ্র নন, জগদিশপুর গ্রামের অন্তত ১৫০টি পরিবার একই দুর্ভোগে পড়েছে। কোথাও টিনের চালা উড়ে গিয়ে অন্য বাড়ির ওপর পড়েছে, কোথাও পুরো ঘর মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঝড়ে আহত হয়েছেন অন্তত ৫ জন, যাদের স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন।
ঝড়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে কৃষিতে। মাঠজুড়ে বোরো ধান, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। চোখের সামনে সারা মৌসুমের পরিশ্রম নষ্ট হতে দেখে হতাশ কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জ, শাখাহার, কোচাশহর, কাটাবাড়ী এবং পলাশবাড়ী উপজেলার কাশিয়াবাড়ি, হরিনাথপুর, মনোহরপুরসহ একাধিক ইউনিয়নের ওপর দিয়ে এই ঝড় বয়ে যায়। এতে অন্তত দুই শতাধিক বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও ঘরের চালা গাছের ডালে ঝুলছে, কোথাও পুরো ঘর উড়ে গিয়ে পাশের বাড়ির ওপর আছড়ে পড়েছে। উপড়ে গেছে অসংখ্য গাছপালা, ভেঙে পড়েছে দেয়াল।
এদিকে একই দিনের ঝড়ের সঙ্গে থাকা বজ্রপাত কেড়ে নিয়েছে পাঁচটি প্রাণ। সুন্দরগঞ্জে তিনজন, সাঘাটায় একজন এবং ফুলছড়িতে একজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুজন।
মানবাধিকারকর্মী গোলাম রাব্বী মুসা বলেন, ‘এটা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ না, অনেক মানুষের জন্য এটা বেঁচে থাকার লড়াই হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া জরুরি, বিশেষ করে যারা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।’
গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। খুব শিগগিরই সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।'

logo-2-1757314069.png)
