তিস্তার চর জুড়ে সবুজ বিপ্লব, ভাঙনের ক্ষত পেরিয়ে শত কোটি টাকার ফসলের সম্ভাবনা
নাজমুল হুদা, নীলফামারী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৩৮
একসময় ভাঙন আর বন্যার ভয়াল থাবায় দিশেহারা ছিল তিস্তা তীরবর্তী জনপদ। ঘরবাড়ি, আবাদি জমি হারিয়ে অনেক পরিবার হয়েছিল নিঃস্ব। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই তিস্তা নদীই এখন হয়ে উঠেছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে গড়ে উঠেছে সবুজের সমারোহ, যেখানে উৎপাদিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ ফসল—যার বাজারমূল্য প্রায় শত কোটি টাকা।
ডিমলা উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬টির ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদী দীর্ঘদিন ধরে ভাঙনের মাধ্যমে জনপদকে করেছে ক্ষতবিক্ষত। তবে বর্ষা শেষে নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচরগুলো এখন কৃষির জন্য নতুন আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে ছিল পানির বিস্তৃতি, সেখানে এখন দিগন্তজোড়া ফসলের ক্ষেত।
উজান থেকে নেমে আসা পলি ও বালুর স্তরে গঠিত চরগুলোতে ঝুঁকি নিয়েই চাষাবাদ শুরু করেন স্থানীয় কৃষকেরা। বর্তমানে ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার অন্তত ১১টি চরে গম, ভুট্টা, সরিষা, কালোজিরা, আলু, পেঁয়াজ, বাদামসহ বিভিন্ন শাক-সবজি, বাঁধাকপি ও মিষ্টি কুমড়ার চাষ হচ্ছে। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকদের মুখে ফিরেছে স্বস্তির হাসি।
স্থানীয় কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, “একসময় এই জায়গা নদীর পানিতে ডুবে থাকত। এখন এখানে চাষ করে ভালো আয় হচ্ছে।” একইভাবে সনতেস আলী ও আবেদ আলী জানান, চরাঞ্চলের এই আবাদ তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ডিমলা ও জলঢাকা এলাকার প্রায় ৪৪০০ হেক্টর চরাঞ্চলের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ জমিতে বর্তমানে চাষাবাদ হচ্ছে। এসব জমিতে উৎপাদিত ফসলের সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় শত কোটি টাকার কাছাকাছি।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, চরাঞ্চলের মাটিতে উচ্চমূল্যের বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষকদের আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছি। সঠিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে পারলে এই অঞ্চল উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত নদী ব্যবস্থাপনা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে তিস্তার চরাঞ্চল হতে পারে দেশের কৃষিখাতের নতুন শক্তি। যে নদী একদিন কেড়ে নিয়েছিল মানুষের সবকিছু, আজ সেই তিস্তাই ফিরিয়ে দিচ্ছে জীবিকার নতুন সম্ভাবনা ও স্বপ্নের আলো।

logo-2-1757314069.png)
