আকাশে বৃষ্টি নাই, পাম্পেও তেল দেয় না, আমরা কৃষক বাঁচমু কেমনে!
শাওন মোল্লা, জামালপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬, ২০:১৭
“আমরা কৃষক মানুষ, আকাশে বৃষ্টি নাই, পাম্পেও তেল দেয় না, আমরা বাঁচমু কেমনে? চোখে মুখে হতাশা আর কণ্ঠে ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন জামালপুর সদর উপজেলার লক্ষীরচর ইউনিয়নের গ্রামের কৃষক আনোয়ার মিয়া।
জামালপুর সদর উপজেলার শরিফপুর ইউনিয়নের চর যথার্থপুর এলাকায় গিয়ে কথা হয় আনোয়ার মিয়ার সাথে। বিস্তীর্ণ মাঠের মাঝে সেচ মেশিনের পাশে বসে আছেন তিনি। চলতি মৌসুমে তার চার একর জমিতে আবাদ করেছেন ভুট্টা ও করলা। টানা কয়েকদিন ধরে তেলের অভাবে জমিতে পানি দিতে পারছেন না তিনি, এতে করে ফসলের মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে, গাছ গুলো মরে যাচ্ছে। এসময় কোথাও তেল না পেয়ে ক্ষোভের সাথে তিনি বলেন- “আমরা কৃষক মানুষ, আমাদের অবস্থা এখন অনেক খারাপ,এখন আমাদের অবস্থা কাদের বলবো। দেশের সরকার কেই বলবো নাকি পাবলিক কেই বলবো,আমরা কৃষি কাজ করি,কোন জিনিস ঠিক মতো পাই না ,পাইনা সার, পাইনা ডিজেল। আমাদের মেশিন ডিজেল দিয়ে চলে। আকাশেও কোন বৃষ্টি নাই, পাম্প থেকেও তেল দেয় না। কয়েকদিন ঘুরে ১ থেকে ২ লিটারের বেশি দেয় না।”
আবেগ তাড়িত কণ্ঠে আনোয়ার মিয়া আরো বলেন- “চরের মধ্যে কারেন্ট নাই, মেশিন ছাড়া পানিও দিতে পারি না, ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এহন আমরা কি করবো? আমরা কি এ দেশের নাগরিক না? আমরা কৃষকরা যদি সুবিধা না পাই, তাইলে বাঁচবো কেমনে।”
শুধু আনোয়ার মিয়া নয়। তার মতো একই অবস্থা শতশত কৃষকের।
একই গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কাঁচা মরিচ আর শশা চাষ করেছেন তার এক একর জমিতে। টানা কয়েকদিন জমিতে পানি না দিতে পেরে মাটিতে হেলে পড়েছে তার গাছগুলো। তাই অন্য কোন ব্যবস্থা না পেরে স্ত্রী কে সাথে নিয়েই গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। এসময় তিনি বলেন- “কয়েক দিন যাবৎ তেলের জন্য ক্ষেতে পানি দিবার পাইতাছি না, গাছ গুলো মরে যাচ্ছে, এবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই ফসল গুলো লাগাইছি। এগুলো পরিশোধ করবো কি ভাবে? আর আমরাই চলবো কিভাবে, কয়েকদিন ঘুরে ২-৩ লিটার তেল পাই। তাও দাম বেশি দিয়ে নিতে হয়।”
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির ঢেউ এসে সরাসরি আছড়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলেও। জ্বালানি তেলের অস্থিরতা ও সরবরাহ সংকটের প্রভাব শুধু সড়কপথেই নয়, মারাত্মকভাবে আঘাত হেনেছে কৃষি খাতেও। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিন এনে দিন খাওয়া এ অঞ্চলের কৃষকেরা।
আরেক কৃষক হারুন মিয়া জানান- “আজকে তিন লিটার তেল পেলাম, এই টুকু দিয়েই মেশিন টা চালু করতেছি। দেখা যাক কতোক্ষণ চলে মেশিন।”
টানা কয়েকদিন ক্ষেতে পানি দিতে না পারায় অল্প সময়ের মধ্যেই ফসলি জমির মাটি শুকিয়ে চৌচির হয়ে যাচ্ছে, নুয়ে পড়ছে ধান ও সবজির গাছ। পানির অভাবে অনেক ক্ষেতেই ইতোমধ্যে ফসলের ক্ষতি শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
কৃষক ফয়সাল উদ্দিন বলেন- যতটুকু তেল পাইছিলাম তা দিয়ে আজকে টানা কয়েক ঘন্টা ক্ষেতে পানি দিলাম। কিন্তু এদিক দিয়ে পানি যা দেই তা কিছুক্ষণ পরেই শুকিয়ে যাচ্ছে। তেলের জন্য আমরা যখন ক্ষেতের পানি প্রয়োজন তখন তো দিতে পারতাছি না এতে আমাদের ফসলের অনেক ক্ষতি হচ্ছে।”
এ মৌসুমে টমেটো, করলা, ভুট্টা, ধান, শসা, তরমুজসহ বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ করেছেন কৃষকেরা। তবে সেচের পানির অভাবে এসব ফসল এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (পিপি) জেসমিন জাহান বলেন-“ডিজেলের কোন সংকট নেই। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ মজুত রয়েছে তা দিয়ে সেচ কার্যক্রম করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশা করছি।”
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ. কে. এম. আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, সাধারণ যাত্রী বা সাধারণ গাড়ির তুলনায় আমাদের কৃষক কি পরিমান তেল পাবে এটা কিন্তু সরকারের একটা নির্দেশনা রয়েছে। কেও যদি সেই নির্দেশনা না মানে,এবং আমাদের কাছে অভিযোগ জানায় তাহলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো, এবং তার জ্বালানি আমরা নিশ্চিত করবো।
জামালপুর জেলার সাতটি উপজেলায় ডিজেল চালিত সেচপাম্প রয়েছে ৩৬ হাজার ও বিদ্যুৎ চালিত রয়েছে ১৯ হাজার ৭০০ ।

logo-2-1757314069.png)
