Logo
×

জেলার খবর

যমুনার আগ্রাসনে জামালপুরের মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে খোলাবাড়ি

Icon

শাওন মোল্লা, জামালপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩৫

যমুনার আগ্রাসনে জামালপুরের মানচিত্র থেকে মুছে যাচ্ছে খোলাবাড়ি


সব হারায়ে এখন মানুষের বাড়িতে কাজ কইরা খাই  কথাগুলো বলতে বলতে চোখ ছলছল হয়ে ওঠে ষাটোর্ধ রাহেলা বেগমের। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ি এলাকার এই নারী জীবনে তেরো বার যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছেন। এক সময় সচ্ছল সংসার থাকলেও আজ তিনি ঘরহারা, আশ্রয় নিয়েছেন অন্যের জমিতে। তাঁর জীবনের গল্প যেন যমুনা তীরের হাজারো অসহায় মানুষের প্রতিচ্ছবি।


শুধু রাহেলা বেগম নন, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ি এলাকার ৫৩ বছর বয়সী বিধবা তাজ্জিনা বেগমের জীবনেও একই চিত্র, তিন বার ভাঙনের পর যমুনা নদীর পাড়েই ছিলো তার দোচালা ঘর। সম্প্রতি শেষ আশ্রয়স্থলটিও নদী গর্ভে। এরপর থেকেই খোলা আকাশের নিচে রয়েছে অসহায় এই নারী।


শুষ্ক মৌসুমে যমুনা নদীর অসময়ের ভাঙনে এমন আর্তনাদই এখন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ি ও আশপাশের গ্রামের মানুষের। গত দুই মাস ধরে চলা এই ভাঙনে কয়েক হাজার বসতভিটা ও শত শত একর ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে জামালপুর জেলার একমাত্র নৌ থানা, খোলাবাড়ি বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মাদ্রাসা।


গত দুই মাস ধরে ভাঙন চললেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।


স্থানীয়রা জানায়, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার চিকাজনী ইউনিয়নের খোলাবাড়ি থেকে চরডাকাতিয়া হয়ে বড়খাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন চলছে। ওই অংশের মধ্যে খোলাবাড়ি, হাজারী, মাগুরীহাট, চর মাগুরীহাট, খানপাড়া, মাঝিপাড়া, ডাকাতিয়া গুচ্ছগ্রাম, চরডাকাতিয়া ও চর ডাকাতিয়া পাড়ার গ্রামের কয়েক হাজার বসতভিটা ও শত শত একর ফসলি জমি নদীর গর্ভে বিলীন হয়েছে।  মাঝে মধ্যে কয়েকটি স্থানে পানি উন্নয়ন বোর্ড শুধু তীব্র ভাঙনের সময় কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙনরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ওইসব স্থাপনা নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভাঙনের শিকার বহু পরিবার ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কেউ অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়েছে, কেউবা রাস্তার পাশে অস্থায়ী ঘর তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে। 


সরেজমিনে দেখা যায়, নদীতে পানি কম থাকলেও তীর ভেঙে পড়ছে। কিছুক্ষণ পরপর ভাঙনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। নৌ থানার অদূরেই ভাঙন দেখা দিয়েছে। পাকা সড়ক ধসে গেছে, বসতভিটার গাছপালা ভেঙে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্ত। এক সময়ের ব্যস্ত খোলাবাড়ি বাজার এখন বালুচরে পরিণত হয়েছে।


ভাঙ্গনের শিকার রাহেলা বেগম জানান, এক ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার ছিল। নদীভাঙন একে একে সব কেড়ে নিয়েছে। এখন মানুষের বাড়িতে কাজ করা, মৌসুমি ফসল তোলা, মাটি কাটার শ্রম দিয়েই কোনোমতে জীবন চালাতে হয়। কাঁথা সেলাই করেও আয় করেন। এসময় কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন,এমনে কইরাই বাঁচতাছি।  নদীটা আর আমাদের কিছুই রাখেনি। আমগরে এহানে একটা শক্ত বাঁধ আর একটা ঘর চাই। 


খোলা বাড়ি এলাকার বাসিন্দা শিহাব উদ্দিন বলেন,বাড়িঘর সব গেছে গা। যেগুলো আছে, সেগুলোও চলে যাবে। ভেঙ্গে চুরে যাচ্ছে। চিন্তা ভাবনা করে বাচি না। এক কাঠা সম্পত্তি নাই। হাতের উপর সংসার। কাজ করে ভাত খাই। এখন কোথা ছেড়ে কোথা যায়? অসহায়। কোথায় যাওয়ার জায়গা নেই।


রুবেল হোসেন বলেন,প্রায় ২০০ ঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। টিনশেড ঘর। এখনতো ছুনের কোনো ঘর নাই। নদীগর্ভে যে সমস্ত জমিগুলো চলে গেছে। তারা তো এখন অসহায়। তাদের অন্যখানে জমিও নাই। তারা বাড়িও করে থাকতে পারবো না।


এ বিষয়ে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বলেন, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। স্থায়ী ভাঙনরোধে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।